সব ছবি ফ্লপ, তবু ১১০ কোটি টাকার মালিক তিনি
· Prothom Alo

বলিউডে তারকাসন্তানের অভাব নেই। কিন্তু তারকাসন্তান হয়ে জন্ম নেওয়া যেমন সহজ, তেমনি নিজের যোগ্যতায় দর্শকের স্বীকৃতি অর্জন করা ততটা সহজ নয়। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই নিজের পথ তৈরি করছেন জাহ্নবী কাপুর। অভিনয়ের শুরু থেকেই তুলনা, প্রত্যাশা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। আজ ৬ মার্চ অভিনেত্রীর জন্মদিন, এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।
তারকা পরিবারে জন্ম
Visit chickenroadslot.lat for more information.
১৯৯৭ সালের ৬ মার্চ ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম জাহ্নবী কাপুরের। তিনি বলিউডের প্রযোজক বনি কাপুর ও অভিনেত্রী শ্রীদেবীর বড় মেয়ে। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে শ্রীদেবী ছিলেন এক অনন্য নাম। ফলে ছোটবেলা থেকেই জাহ্নবী ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। তাঁর ছোট বোন খুশি কাপুরও এখন অভিনয়ে যুক্ত। ফলে বলা যায়, অভিনয় যেন তাঁদের পরিবারেরই উত্তরাধিকার। তবে জাহ্নবীর শৈশব ছিল কিছুটা ভিন্ন। মা শ্রীদেবী চেয়েছিলেন, মেয়েরা যেন প্রথমে পড়াশোনায় মন দেন। তাই ছোটবেলা থেকেই জাহ্নবীকে চলচ্চিত্রের আড়ম্বর থেকে কিছুটা দূরে রাখা হয়েছিল।
অভিনয়ের প্রস্তুতি
অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় কৈশোরেই। এরপর অভিনয় শেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত বিখ্যাত লি স্ট্রাসবার্গ থিয়েটার অ্যান্ড ফিল্ম ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নেন জাহ্নবী। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই অভিনয় শিখেছেন বহু হলিউড তারকা। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং বলিউডে অভিষেকের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ধড়ক’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে জাহ্নবী কাপুরের। ছবিটি ছিল মারাঠি সুপারহিট ‘সাইরাত’–এর হিন্দি সংস্করণ। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ঈষান খাট্টার। বক্স অফিসে ছবিটি মোটমুটি ব্যবসা করে। তবে জাহ্নবীর অভিনয়ে আড়ষ্টতা নিয়ে সমালোচনা ছিল।
তবে এই অভিষেকের আগে ঘটে যায় জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। ছবির মুক্তির কয়েক মাস আগেই মারা যান তাঁর মা শ্রীদেবী। সে সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন জাহ্নবী। তবু মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে অভিনয়ের পথেই এগিয়ে যান তিনি।
ধীরে ধীরে নিজস্ব পরিচয়
প্রথম ছবির পর অনেকেই ভেবেছিলেন, জাহ্নবী হয়তো কেবল তারকা পরিবারের সুবিধা নিয়েই এগোবেন। কিন্তু পরবর্তী কাজগুলোতে তিনি ভিন্ন ধরনের চরিত্র বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ২০২০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গুঞ্জন সাক্সেনা: দ্য কারগিল গার্ল’ ছবিতে তিনি অভিনয় করেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর নারী পাইলট গুঞ্জন সাক্সেনার চরিত্রে। বাস্তব চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তাঁকে বেশ প্রশংসা পেতে হয়।
এরপর জাহ্নবী অভিনয় করেন ‘রুহি’, ‘গুড লাক জেরি’, ‘মিলি’ ইত্যাদি ছবিতে। পরে তাঁকে আরও দেখা যায় এনটিআর জুনিয়রের সঙ্গে ‘দেবারা: পার্ট ওয়ান’-এ। গত বছর আলোচিত নীরজ ঘেওয়ানের ‘হোমবাউন্ড’-এও ছিলেন তিনি। তবে জাহ্নবীর অভিনীত কোনো সিনেমাই সেভাবে ব্যবসা করেনি। দু–একটি ছবিতে অভিনয়ের ঝলক দেখিয়েছেন বটে, কিন্তু মোটাদাগে তাঁর অভিনয় ছিল গড়পড়তা।
বলিউডে এখন নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র। সারা আলী খান বা অনন্যা পান্ডে—সবাই নিজের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। এ প্রতিযোগিতার মধ্যেই জাহ্নবী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন অভিনয়ের মাধ্যমে। তিনি প্রায়ই বলেন, ‘তারকাসন্তান হিসেবে সুযোগ পাওয়া যায়, কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা অর্জন করতে হলে কাজ দিয়েই প্রমাণ দিতে হয়।’
জাহ্নবী কাপুর। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকেজাহ্নবী কি প্রযোজকদের বোঝা?
নয় নয় করে আট বছরে গড়িয়েছে জাহ্নবী কাপুরের ক্যারিয়ার। এর মধ্যে অভিনেত্রীর ঝুলিতে বলার মতো সিনেমা আছে কমই। সিনেমা পরিবারের মেয়ে জাহ্নবী। মা প্রয়াত অভিনেত্রী শ্রীদেবী, বাবা বনি কাপুর। তাই তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে প্রায়ই। তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিলেন বনি কাপুর। আজকাল অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিক বেড়েছে, এ ছাড়া তাঁদের নানা ধরনের খরচ প্রযোজকদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। এসব নিয়েই কথা বললেন অভিজ্ঞ প্রযোজক বনি কাপুর। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে তিনি জানালেন, তাঁর মেয়ে জাহ্নবী কাপুর কিংবা ভাই অনিল কাপুর অনেক সময় নিজেদের খরচ নিজেরাই বহন করেছেন, যাতে প্রযোজনার ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে।
‘গেম চেঞ্জার্স’ ইউটিউব চ্যানেলকে বনি কাপুর বলেন, ‘জাহ্নবী যদি একটা ছবির শুটিং করছিল আর অন্য ছবির জন্য অন্য শহরে যেতে হতো, তবে নিজের টিকিট নিজেই কিনত। প্রযোজকের ওপর বোঝা চাপাত না। এমনকি কোনো আত্মীয় বন্ধু বা সহকারী যদি তার সঙ্গে যেত, সেসব খরচও আমি দিয়েছি। এমনকি আমি নিজে ওদের দেখতে গেছি, নিজের টিকিট আর হোটেলের খরচ নিজেই দিয়েছি।’
জাহ্নবী কাপুর। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকেজাহ্নবী কেন বারবার ব্যর্থ হন
প্রথম সিনেমা ‘ধড়ক’ থেকে শুরু করে ‘গুড লাক জেরি’, ‘মিলি’—জাহ্নবী কাপুর অভিনীত অনেকগুলো সিনেমাই ছিল রিমেক। সম্প্রতি হিন্দিতে রিমেক হওয়া বেশির ভাগ সিনেমাই ডাহা ফ্লপ করছে। ব্যতিক্রম হয়নি জাহ্নবী অভিনীত সিনেমাগুলোও। এ ছাড়া তাঁর অভিনীত অন্য সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রেও বলা যায়, তাঁর সমসাময়িক অনেক অভিনেত্রীর চেয়ে তিনি চিত্রনাট্য বাছাইয়ে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেননি।
নীতেশ তিওয়ারি আর নীরজ ঘেওয়ান ছাড়া ক্যারিয়ারে খুব বেশি ভালো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করতে পারেননি জাহ্নবী, এটা তাঁর ব্যর্থতার অন্যতম বড় কারণ। জাহ্নবী অভিনীত বেশির ভাগ সিনেমার নির্মাতা ছিলেন নতুন। এটিও অভিনেত্রীকে ভুগিয়েছে। জাহ্নবী কাপুরকে অভিনয়ে আরও উন্নতি করতে হবে—এটি তাঁর অভিনীত সিনেমা মুক্তির পর সমালোচকদের বড় অভিযোগ থাকে। ক্যারিয়ারে আট বছর পার করে ফেললেও জাহ্নবীর অভিনয়ের দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি
ইনস্টাগ্রামে জাহ্নবী কাপুর ব্যাপক জনপ্রিয়। তাঁর পোস্ট করা আবেদনময় ছবি, ভিডিও নিয়ে অন্তর্জালে চর্চা হয়। ইনস্টাগ্রামে আবেদমনময়ী রূপে দেখা গেলেও পর্দার জাহ্নবী পুরোপুরি অন্য রকম। এখানে বেশির ভাগ সময়ই তাঁকে দেখা যায় ‘পাশের বাড়ির মেয়ে’ টাইপ চরিত্রে। অনেক সমালোচক মনে করেন, নাচে, গানে, অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় জাহ্নবীর সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ, এসব সিনেমায় নায়িকার খুব বেশি কিছু করার সুযোগ থাকে না, মূলত নায়কনির্ভর হয়। কিন্তু জাহ্নবী এখনো এ ধরনের সিনেমায় অভিনয় করেননি। এটিও তাঁর ব্যর্থতার বড় কারণ।
ব্যক্তিগত জীবন ও আলোচনার কেন্দ্র
জাহ্নবীর ব্যক্তিগত জীবনও প্রায়ই আলোচনায় আসে। বিভিন্ন সময় তাঁর সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন শোনা গেছে। ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান শিখর পাহাড়িয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। তবে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা বলতে চান না তিনি। বরং কাজ নিয়েই সামনে থাকতে পছন্দ করেন। কিছুদিন ধরে বলিউড অভিনেত্রী জাহ্নবী কাপুরের বিয়ে নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে মুখ খুলেছেন অভিনেত্রী। অনেক দিন ধরে গুঞ্জন ছিল, জাহ্নবী জমকালো শাড়ি পরে অন্ধ্র প্রদেশের তিরুমালা মন্দিরে বিয়ে করতে চান। এ পোস্টকে ঘিরে শ্রীদেবী-কন্যার প্রতিক্রিয়া ছিল ‘কুছ ভি’। এ প্রসঙ্গে জাহ্নবী বলেছেন, ‘সম্প্রতি আমি একটা অদ্ভুত প্রতিবেদন পড়েছিলাম। এ খবরে বলা হয়েছিল যে আমি নাকি আমার সম্পর্কের ব্যাপারে নিশ্চিত করেছি। আর আমার বিয়ে হবে বলে জানিয়েছি। অনেকে দু-তিনটি প্রতিবেদন একত্র করে রটিয়ে দিয়েছে যে আমি বিয়ে করতে চলেছি। তবে আমি এখন মোটেও বিয়ে করতে রাজি নই। এখন শুধু আমি আমার কাজের প্রতি মনোনিবেশ করতে চাই।’
জাহ্নবী, সারা নাকি অনন্যা, ‘জেন–জি’ তারকাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুসারী কারশিখর পাহাড়িরার সঙ্গে জাহ্নবীর প্রেমের খবর নিয়ে নানা খবর উড়ে বেড়ায়। এ প্রসঙ্গে অভিনেত্রীর জবাব, ‘আমার ১৬ বছর বয়স থেকে ও (শিখর) আমার জীবনে আছে। আমার সব সময় মনে হয়েছে যে আমার স্বপ্ন মানে ওর স্বপ্ন, আর ওর স্বপ্ন মানে আমারই স্বপ্ন। আমরা দুজন একে অপরের অনেক কাছের। আমরা সব সময় একে অপরকে অনেক সমর্থন দিয়ে এসেছি।’
সম্পদের পরিমাণ
অল্প সময়ের ক্যারিয়ার হলেও জাহ্নবী কাপুর ইতিমধ্যে বলিউডের অন্যতম ব্যস্ত তরুণ অভিনেত্রী। বিভিন্ন চলচ্চিত্র, ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট ও বিজ্ঞাপন থেকে তাঁর উল্লেখযোগ্য আয় হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জাহ্নবীর মোট সম্পদের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯০ কোটি থেকে ১১০ কোটি টাকার সমপরিমাণ।
মায়ের ছায়া, নিজের পথ
জাহ্নবী কাপুরের জীবনে শ্রীদেবীর প্রভাব আজও গভীর। প্রায়ই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মায়ের অনুপস্থিতি তাঁকে প্রতিদিনই অনুভব করায়। কিন্তু একই সঙ্গে মায়ের স্মৃতিই তাঁকে কাজের প্রতি আরও মনোযোগী করে। মা শ্রীদেবীকে জাহ্নবী সবচেয়ে বেশি মিস করেন উৎসবের সময়। এ প্রসঙ্গে তিনি আগে বলেছিলেন, ‘মা আমাদের সব ঐতিহ্য আর প্রথার সঙ্গে ছোটবেলায় পরিচিত করিয়েছিলেন। তিনি খুব ধার্মিক মানুষ। দেওয়ালির দিন মা সারা বাড়ি সাজিয়ে তুলতে ভালোবাসতেন। মা পরিবারের সব নারীকে নিয়ে দেওয়ালি বড় করে উদ্যাপন করতেন। উৎসবের দিন তিনি ঐতিহ্যবাহী পট্টু শাড়ি পরতেন। আমি আর আমার বোন খুশি—দুজনই প্রতিবার পট্টু পাওদায়ির সেট পেতাম। দেওয়ালি ছাড়া গণেশ চতুর্থীতে সবাই এক হতাম। আমাদের বাড়িতে বড় করে করবা চৌথ উদ্যাপন করা হতো। এভাবেই ভারতীয় রীতি, নীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আমাদের জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এসব উৎসবের হাত ধরে আমি আমার মায়ের আরও কাছে এসে গিয়েছিলাম বলে আমি মনে করি।’
হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বনে